নারীরা লড়েছেন সমানতালে, এখন কেন আড়ালে
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ‘৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে খেয়াল করি, দৃশ্যপট থেকে আমি কমপ্লিট (পুরোপুরি) নাই। ভ্যানিশ (অদৃশ্য) হয়ে গেছি। ক্যামেরা কিছু ছেলেদের ফোকাস (আলোকপাত) করে, তারা আন্দোলনের মহানায়ক। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের...
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
‘৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে খেয়াল করি, দৃশ্যপট থেকে আমি কমপ্লিট (পুরোপুরি) নাই। ভ্যানিশ (অদৃশ্য) হয়ে গেছি। ক্যামেরা কিছু ছেলেদের ফোকাস (আলোকপাত) করে, তারা আন্দোলনের মহানায়ক। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে দেখলাম, তারাও একই রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’ কথাগুলো বলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে সমন্বয়ক হিসেবে নিজের ভূমিকা ও পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা এভাবেই বর্ণনা করেন তিনি।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘গণ–অভ্যুত্থানের নারীদের সংলাপ, নারীরা কোথায় গেল?’ শিরোনামের অনুষ্ঠানে উমামা ফাতেমার মতো আক্ষেপ জানান আরও কয়েকজন নারী। আন্দোলনে সমানতালে লড়াই করে এখন
এখন কেন আড়ালেপ্রথম পৃষ্ঠার পর
কেন তাঁরা কোনো আলোচনায় নেই, সেই প্রশ্ন ছিল তাঁদের।
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের সময় ও এরপরে গঠিত স্বেচ্ছাসেবী দল ‘এমপাওয়ারিং আওয়ার ফাইটার্স’ ও ‘লড়াকু ২৪’ যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে। নারীদের কথা শোনার জন্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান শিরীন হক, অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মির্জা তাসলিমা সুলতানা। সংলাপটি সঞ্চালনা করেন ‘লড়াকু ২৪’-এর সংগঠক কানিজ ফাতেমা মিথিলা এবং ‘এমপাওয়ারিং আওয়ার ফাইটার্স’-এর সংগঠক কলি কায়েয।
অনুষ্ঠানকক্ষের প্রবেশপথে এই অভ্যুত্থানের শহীদ রিয়া গোপ, নাঈমা সুলতানা, লিজা আক্তার, মায়া ইসলাম, মেহেরুন নেসা, নাজমা বেগম, তানহা, সুমাইয়া আক্তার, নাফিসা হোসেন মারওয়াসহ কয়েকজন নারীর ছবি রাখা হয়েছিল একটি বেদির ওপর। বেদিতে ফুল রেখে প্রদীপ জ্বালানো হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনে প্রাণ উৎসর্গ করা এই নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। সংলাপে বক্তারা আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারীদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া, নারীদের প্রতি সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান।
সংলাপে কথা বলতে নারীরা ফিরে যাচ্ছিলেন উত্তাল সেই সময়ে। সরকারি বরিশাল কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস আর কামরাঙ্গীরচরের ওয়াজউদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া আক্তার জান্নাতের সাহসিকতার গল্প শুনে মুহুর্মুহু করতালিতে অভিবাদন জানান উপস্থিত ব্যক্তিরা।
১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে হামলায় গুরুতর আহত সামিয়া আক্তার বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় বাড়ি এসে তাঁর মাকে অনেকে কটুকথা শুনিয়েছেন। মা–বাবা তাঁর পক্ষেই ছিলেন। বাকি সময় তিনি আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন মুখে কাপড় বেঁধে, যাতে কেউ তাঁকে চিনতে না পারে।
শুধু পুরুষদের জন্য নয়, এই আন্দোলন সফল হয়েছে ব্যাপকভাবে নারীদের অংশগ্রহণের কারণে বলে উল্লেখ করেন নোয়াখালীর শিক্ষার্থী সুমাইয়া রিশু।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, আন্দোলনে অনেক কৌশল করে, বাড়িতে মিথ্যা বলে, কোচিংয়ের কথা বলে, মায়ের পা ধরে সামাজিক ঘেরাটোপ ভেঙে নারীরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। আন্দোলনের পর ওই নারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক হারে হয়রানির শিকার হন। সরকারকে বলার পর মনে হয়েছে, এটাকে তাঁরা বড় বিষয় মনে করেননি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নাজিফা জান্নাত বলেন, অনেক উদ্দীপনা নিয়ে নারীরা আন্দোলনে ছিলেন। এখন এসে সবাইকে যেন বোঝাতে হচ্ছে নারীরাও ছিল। এখন কোথাও নারীদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না বলে নিজেদের কথা জানাতে ফোরাম তৈরি করতে হচ্ছে।
আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সহায়তা ও মানসিক সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন অনেক নারী। তাঁদের একজন ধানমন্ডির বাসিন্দা অর্থী জুখরিফ বলেন, ওই সময় অনেক শিক্ষার্থী ভবনগুলোর সামনে এসে পানির জন্য, আশ্রয়ের জন্য আকুলতা জানাতেন। কেউ দরজা খুলতেন না। এই দৃশ্য দেখে বাসার গ্যারেজে তাঁরা চিকিৎসা দেন।
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আসমা করিম বলেন, আহত ব্যক্তিদের জন্য তাঁরা যে তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন, তার দাতাদের বেশির ভাগই ছিলেন নারী। একই তথ্য দেন আহতদের চিকিৎসা সহায়তায় এগিয়ে আসা ভিশনারি ভয়েস নামের একটি সংগঠনের প্রতিনিধি ফারহানা শারমিন।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন উত্তরায় বাসার বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ নাঈমা সুলতানার (১৫) মা আইনুন নাহার, আন্দোলনে আহত প্রবীণ নারী মাসুরা বেগম, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শামীমা সুলতানা, আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমজীবী নারী সামিনা ইয়াসমিন, নরসিংদী সরকারি কলেজের শিক্ষক নাদিরা ইয়াসমিন, ‘চব্বিশের উত্তরা’ সংগঠনের প্রতিনিধি সামিয়া রহমান প্রমুখ।
